রমজানের স্বাস্থ্যকর ইফতার
আহলান সাহলান মাহে রমজান। আলহামদুলিল্লাহ রহমত, বরকত ও নাজাতের অফুরান কল্যাণের বার্তা নিয়ে পুণ্য বৈভবে এলো পবিত্র রমজান।
রোজা রাখার পর প্রথম খাবার ইফতার। তাই সেটা স্বাস্থ্যকর হওয়া খুব গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত আমাদের ইফতারে মুখরোচক, ভাজাপোড়া খাবার ছাড়া চলেইনা। এগুলোতে প্রচুর তেলের ব্যবহার হয়, যা শরীরে ট্রান্সফ্যাট তৈরি করে। যারা বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে আছেন, তাদের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে তোলে। এছাড়াও এসব খাবারে প্রচুর লবণ রয়েছে, যা শরীরকে পানিশূণ্য করে। অ্যাসিডিটি বাড়ায়, অস্বস্তি তৈরি করে। তাই, এধরণের খাবার এড়িয়ে চলাই ভালো। এজন্য বাড়িতে তৈরি স্বাস্থ্যকর খাবারের ওপর জোর দিতে হবে।
প্রথমত একটু সময় নিয়ে ধীরে ধীরে আমাদের খাবার খাওয়া উচিত। কিছু গবেষণায় এসেছে মস্তিষ্কে খাবারের সংবেদন পৌঁছাতে একটু সময় লাগে। এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাড়াহুড়া করে খাওয়া শুরু করলে অধিভোজের ঝুঁকি বাড়ে। শুরুতে ২-৩টি খেজুর খেয়ে পানি পান করে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হবে। আনুমানিক ১০ থেকে ১৫ মিনিট বিরতি দিয়ে তুলনামূলক ভারি খাবার খাওয়া উচিত। এই সময়ে আপনি চাইলে নামাজ পড়ে নিতে পারেন।
খেজুর মিষ্টি ফল। তাই দ্রুতই রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যায়। এছাড়াও এতে থাকা এনজাইম দ্রুত খাবার হজমে সাহায্য করে। তাই খাবারের শুরুতে খেজুর খাওয়া পরিপাকের জন্য উপকারী।
একবারে বেশি পানি পানের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি একবারে বেশি পানি পান করা কিডনির ওপর চাপ বাড়ায়। তাছাড়া এর ফলে ঠিক মতো খাবার খাওয়া যায় না। তাই ইফতারের পর থেকে খানিকক্ষণ পর পর অল্প অল্প করে পানি পান করতে হবে।
ইফতারে যেন সুষম খাবার থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। খুব বেশি ভারী বা তেলধর্মী খাবার যেমন- ভাজাপোড়া, বিরিয়ানি, কাচ্চি, কষানো মাংস ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো। এতে পেট গরম হওয়া, গ্যাস সৃষ্টি, হজমে গোলযোগ ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে তেলে ভাজা একেবারে বাদ না দিয়ে দু একটি উপাদান তেলে ভেজে খেলে কোনো ক্ষতি নেই। কারণ আমাদের দেহে তেলের প্রয়োজন আছে। এ তেল শরীরে শক্তি জোগাবে, হজমে সাহায্য করবে, ত্বকের মসৃণতা বজায় রাখবে। তবে কোন ধরনের তেল এবং কতখানি উচ্চতাপে ভাজা হবে সেটা লক্ষ্য রাখতে হবে। একই তেল বারে বারে ব্যবহার করা যাবে না। এতে দেহে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হয়। আবার উচ্চতাপে ট্রান্স ফ্যাট তৈরি হয় বলে হৃদরোগীসহ অন্যদের ক্ষতির কারণ হয়। খেজুর ও পানীয় গ্রহণের পরে ফল মূল, সবজি ধরনের খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। এগুলো দেহ থেকে ‘টক্সিন’ বা বিষাক্ত পদার্থ বের করে দিতে সহায়তা করে। আবার ইফতারে পেট ঠাণ্ডা থাকে এমন খাবার যেমন- দুধচিড়া, দই-চিড়া বা মুড়ি খাওয়া ভালো। এতে থাকা শর্করা রক্তের শর্করার ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করে।
এছাড়াও, প্রোটিন ধরনের ও অপেক্ষাকৃত ভারী খাবার সব শেষে খেতে হবে। ডিম, মুরগির মাংস, মাছ ইত্যাদি খাওয়া পেশি গঠনে ভূমিকা রাখে। ইফতারের মূল খাবার হিসেবে এসব খাবার রাখা যেতে পারে।
আস্তে আস্তে হালকা থেকে ক্রমশ ভারী খাবার খাওয়ার মাধ্যমে মস্তিষ্ক ও পরিপাকতন্ত্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে খাবার হজম সহজ হয়।
যদি একটি আদর্শ মুখরোচক ইফতারির প্লেট তৈরি করা হয়,ঘরে তৈরি যেকোনো একটি পানীয় যেমন, চিনি ছাড়া ফলের জুস, ডাবের পানি,আখের গুড়ের শরবত,লেবু-মধু পানি,লাচ্ছি,তোকমা বা ইসুবগুলের শরবত, এবং কাঁচা ছোলা, কম তেলে ভাজা ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি অথবা আলুর চপ বা যে কোনো একটি তেলে ভাজা, মুড়ি অথবা চিড়া এবং ফল। অন্যদিন হালিম অথবা খিচুড়ি খাওয়া যেতে পারে সেদিন বেসনের বা ডালের তৈরি ভাজা খাবার এবং মুড়ি বা চিড়া বাদ দিতে পারেন। আবার নুডলস অথবা ফ্রায়েড রাইস খেলেও মুড়ি অথবা চিড়া বাদ দিতে হবে। ইফতারির কাঁচা ছোলার সঙ্গে আদা কুচি, লবণ ও পুদিনা পাতা কুচি দিয়ে খাওয়া যায়। এটা হজমে যেমন সহায়ক, তেমনি ভিটামিন ও খনিজ লবণের ঘাটতি এতে দূর হবে। রমজানের সময় ইফতারিতে খেজুর একটি বিশেষ উপাদান হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রতিদিন অন্যান্য খাবারের সঙ্গে একটি বা দুটির বেশি খেজুর খাওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই। কারণ, এতে ক্যালরি ও শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে।
সুস্থতায় পবিত্র মাস আমাদের শেষ হোক।
কার্টেসি: পুষ্টি ডাক্তার: স্বাস্থ্য সেবায় নিবেদিত প্রাণ



Comments
Post a Comment