এ আই এখন আপনার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারবে

মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ নিয়ে গবেষণায় প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। ২০১৬ সালে নিউরালিংক প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে তারা মানুষের মস্তিষ্কে চিপ বসানোর মাধ্যমে মস্তিষ্কের সংকেত বিশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময় মেটাও নিউরোটেকনোলজি গবেষণায় মনোযোগ দেয়, তবে তাদের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। মেটা এমন একটি প্রযুক্তি তৈরি করতে চেয়েছিল, যা অস্ত্রোপচার ছাড়াই মানুষের মস্তিষ্কের সংকেত গ্রহণ করে টাইপ করতে পারবে।  


মেটার অর্থায়নে গবেষকরা প্রাথমিক পর্যায়ে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বসানো ইলেকট্রোড ব্যবহার করে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বিশ্লেষণ করে ভাষা ডিকোড করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশেষ করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। তবে সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারভিত্তিক প্রযুক্তি খুব একটা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই একটি পরিধানযোগ্য ও অপসারণযোগ্য ডিভাইসের প্রয়োজন, যা মানুষের শরীরের স্থায়ী অংশ হবে না।  


কিছু বছর আগে মেটা তাদের ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস তৈরির প্রকল্প বন্ধ করে দেয়, কারণ সে সময়ের প্রযুক্তি বাজারে আনার মতো পর্যাপ্ত উন্নত ছিল না। ফলে প্রতিষ্ঠানটি সরাসরি কোনো গ্যাজেট তৈরির পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী নিউরোসায়েন্স গবেষণায় বিনিয়োগ করতে থাকে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল মানুষের মতো ভাষা প্রক্রিয়াকরণে সক্ষম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরি করা। এরই ধারাবাহিকতায় গবেষকরা মস্তিষ্ক কীভাবে ভাষা গঠন করে তা বিশ্লেষণ শুরু করেন।  


সম্প্রতি মেটা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছে। বাস্ক সেন্টার অন কগনিশন, ব্রেইন অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ-এর সহযোগিতায় তারা অস্ত্রোপচার ছাড়াই মানুষের মুখ ফুটে বলার আগেই তার চিন্তার ভাষাগত রূপ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ, মস্তিষ্কে কোনো চিপ বসানো ছাড়াই ব্রেইন সিগনালের পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যদিও এই গবেষণা এখনো পরীক্ষাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তবে এটি পরিধানযোগ্য ব্রেইন-রিডিং ডিভাইস তৈরির পথে এক বিশাল অগ্রগতি।  


এর আগে মানুষের চিন্তাভাবনা সরাসরি ডিকোড করার জন্য মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড বসানো ছাড়া অন্য কোনো কার্যকর উপায় ছিল না। তবে ২০২৩ সালে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা fMRI এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে মানুষের মস্তিষ্কে তৈরি হওয়া ভাষার সাধারণ বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করতে সক্ষম হন। কিন্তু fMRI যন্ত্রের উচ্চমূল্য ও বিশাল আকৃতির কারণে এটি ল্যাবের বাইরে ব্যবহার করা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে গবেষকরা বিকল্প পদ্ধতির সন্ধান করেন।  


মেটার সাম্প্রতিক গবেষণায় ৩৫ জন স্বেচ্ছাসেবকের অংশগ্রহণে MEG স্ক্যানারের মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের সংকেত সংগ্রহ করা হয়। কিছু অংশগ্রহণকারীর ক্ষেত্রে EEG ইলেকট্রোড ব্যবহার করা হয়, যা মস্তিষ্ক থেকে নির্গত বৈদ্যুতিক সংকেত সংগ্রহ করে। এরপর এসব তথ্য ব্যবহার করে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ট্রেইন করা হয়, যাতে এটি নির্দিষ্ট শব্দ বা অক্ষরের সঙ্গে মস্তিষ্কের সংকেতের সম্পর্ক নির্ধারণ করতে পারে। ভাষার কাঠামো বোঝানোর জন্য মডেলটিকে উইকিপিডিয়ার অসংখ্য নিবন্ধ পড়ানো হয়, যাতে এটি বাক্যের প্রসঙ্গ বুঝে সম্ভাব্য ভুল সংশোধন করতে পারে।  


গবেষণায় দেখা গেছে, EEG ব্যবহার করে প্রায় ৩০% ক্ষেত্রে সঠিকভাবে মস্তিষ্কের সংকেত থেকে টাইপ করা অক্ষর পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হয়েছে। যদিও এটি অনেক কম মনে হতে পারে, তবে মাথার বাইরের সংকেত বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। অন্যদিকে, MEG স্ক্যানারের সাহায্যে ৭০-৮০% ক্ষেত্রে ভাষা সঠিকভাবে ডিকোড করা গেছে, যা আগের সব প্রযুক্তিকে ছাড়িয়ে গেছে। যদিও বর্তমানে MEG স্ক্যানারগুলো বিশাল এবং ব্যয়বহুল, গবেষকরা ইতোমধ্যে হেলমেট-আকৃতির পরিধানযোগ্য MEG ডিভাইস তৈরি করেছেন, যা আকারে ছোট ও সংবেদনশীলতাও বেশি। তবে এই ডিভাইসগুলো এখনো শুধুমাত্র চৌম্বকীয়ভাবে সুরক্ষিত পরিবেশে কাজ করতে পারে।  


এই প্রযুক্তি যদি বাণিজ্যিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এটি বিপ্লব আনতে পারে। পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা বাকশক্তিহীন ব্যক্তিরা তাদের মনের কথা অন্যদের কাছে সহজেই প্রকাশ করতে পারবেন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, আমাদের মস্তিষ্কের তথ্যের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত হবে? মেটার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এই ব্যক্তিগত তথ্য কতটা সুরক্ষিত রাখবে, তা নিয়েও ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। প্রযুক্তির এই দ্রুত উন্নয়নের যুগে, মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংযোগ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

কার্টেসি: Echoes of the universe



Comments

Popular posts from this blog

বিয়ে; আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নিয়ামাত।

ইউরোপ-আমেরিকা'য় স্বপ্ন বিসর্জন

চোখ খুলুন। সাবধান হোন। প্রযুক্তির দাস নয়, নিয়ন্ত্রক হন